ঘরের চালেতে ভুতুম ডাকিছে, অকল্যাণ এ সুর

 

হাজী মোহাম্মাদ মহসীন :

গ্রামবাংলার সাড়া জাগানো হুতুম পেঁচা এখন বিলুপ্তির পথে। এ পাখিটি রাতে বিচরণ করে বলে একে নিশাচর পাখি বলা হয়ে থাকে।

গ্রামগঞ্জে পেঁচা দেখলেই অশুভ মনে হয়।সন্ধালগ্নে ঘরের চালে টু-হুইট-টু-হুউ শব্দ শুনে অনেকেই বুঝতে পারে পেঁচা ডাকছে,এতে অমঙ্গল হয়এবং জগড়া-বিবাদ লাগতে পারে।এমন কথা ভেবে ঘরের ওঠায়(ঘরের সিঁড়ি) জল ঢেলে দেয়।গ্রাম্য মানুষের ধারনা অকল্যাণ থেকে হয়ত রক্ষা পাওয়ার জন্য জল ঢেলে দেয় (ঘরের সিঁড়ি)ওঠায়।

কথিত আছে পল্লী-গাঁওয়ে যখন রাত থ্‌ম থ্‌ম স্তব্ধ নিঝুম, ঘোর-আন্ধার ঠিক এমন সময় ঘরের চালে,গাছালিতে পেঁচার হুদ—হুদ; বুম…বুম-বউ; দিবি না ঝিদিবি ডাক রহস্যময় ও নানা কুসংস্কারের জন্ম দেয়।
তখন মা বলে এই বুঝি অকল্যাণের ছাপ পরলো গায়ে।দূর হয়ে যা অলক্ষ্মী পেঁচা।আসলে নিছক  ধারনা কুসংস্কার বাসা-বাধে বলা যায়।

পৃথিবীর যে কোনো প্রাণীর চেয়ে বেশি দৃষ্টি শক্তির অধিকারী হলো পেঁচা।ভিন্ন ভাষায় ঢাকা-ঢাকি করে,তাই দা,খন্তা আগুনে চ্যাঁকা দেয় তখন পেঁচা দূরে চলে যায়।এতে অকল্যাণ কল্যাণ বয়ে আনে।

পেঁচা রাতের বেলা বের হয় শিকারের জন্য।পেঁচাদের দৈহিক বৈশিষ্ট্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো ওদের বড় বড় গোল দুটো চোখ।মাথা ঘুরিয়ে এরা প্রায় পুরোপুরি পেছনের দিকে তাকাতে পারে।
একারণেই এক জায়গায় চুপটি করে বসেই ওরা চারদিকে নজর রাখতে পারে। দিনের আলো পেঁচা সইতে পারে না। পেঁচা এক মারাত্মক শিকারী পাখি। বেশির ভাগ পেঁচারই লম্বা ও ধারালো নখর আছে।

একবার যদি শিকারের খুঁজে পায় অমনি সে বাঁকানো নখড়ের থাবা নিয়ে নেমে আসে শিকার ধরতে। ওদের খাবারে তেমন কোন বাছবিচার নেই। ক্ষুদে ইঁদুর, শুয়োপোকা, ঢোরা সাপ, ব্যাঙ ইত্যাদি । 

দিনের বেলায় গভীর জঙ্গলে কিংবা গাছ-গাছালির ঘনপাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে। এরা মানুষের কোনো ধরনের ক্ষতিই করে না বরং ইঁদুর খেয়ে মানুষের উপকার সাধন করে।
তারপরও এরা মানুষের কাছে অলক্ষ্মী  হিসেবে পরিচিত পায় এই পেঁচা।

পেঁচা সচরাচর জোড়ায়-জোরায় ও পারিবারিক দলে থাকে। রাতের আবছা আলোয় উড়ে এসে শিকার ধরে। খাদ্য তালিকায় আছে উড়ন্ত পোকা, টিকটিকি, ছোট পাখি।খুঁড়ুলে পেঁচার শরীরে বাদামি তিলওয়ালা দাগ থাকে। দৈর্ঘ্যে ২০ সেন্টিমিটার। মাথার পালক বাদামি। গলা সাদা, চোখ ঠোঁট সবুজ, পা ও পায়ের পাতা অনুজ্জ্বল হলদে-সবুজ।

প্রজনন সময় নভেম্বর থেকে এপ্রিল। ডিম সাদাটে, সংখ্যায় ৩টি-৪টি। ২৫ দিনে ডিম ফোটে। ৩০ দিনে ছানাদের গায়ে পালক গজায়।শীতের শেষে ছোট কান পেঁচা বাংলাদেশ ছেড়ে উত্তরে মধ্য ও উত্তর এশিয়ায় চলে যায় গরমকাল কাটানোর জন্য। সেখানেই তারা বাসা বাঁধে। এরা মাটির ওপর বাসা করে চার থেকে ১৪টি ডিম দেয়। স্ত্রী পাখি ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায়। প্রায় ১২ দিন তা দেওয়ার পর বাচ্চা ফোটে। বাচ্চারা এক মাসের মধ্যে উড়তে শেখে। তত দিনে আবার শীতকাল চলে আসে। আর যথারীতি ওরা আবার আশ্রয়ের সন্ধানে আসে গ্রামবাংলা।

বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সাহসী মানুষ তখন স্বস্তি পায় এই ভেবে যে গভীর সংকটের মধ্যেও প্রাণিকুল বেঁচে রয়েছে।হুতোম পেঁচা খুব বড় আকারের শক্তিশালী ধরনের একটি পাখি।বিশ্বে ১৯ প্রজাতির হুতোম পেঁচা রয়েছে। তবে বাংলাদেশে মাত্র দুই প্রজাতির হুতোম পেঁচা দেখা যায়। 

এদের চোখ দুটো সামনের দিকে ঠোঁটের কাছাকাছি স্থাপিত।নিশাচর পাখি বলেই এটি সহজে কারো চোখে পড়ে না। সারা রাত খুঁজে বেড়ালে ভাগ্যক্রমে কেবল এদের দেখা পাওয়া সম্ভব।

তীব্র খাদ্য সংকটের কারণে আমাদের দেশ থেকে হুতোম পেঁচারা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।’

পরিবেশ ভারসাম্যহীনতা ও মানুষের কারণে আজ এক সময়ের এই সাড়া জাগানো পাখিটি গ্রামের আনাচে-কানাছে পড়ে থাকত। এই হুতুম পেঁচাকে নিয়ে গ্রাম বাংলার ছোট ছেলেমেয়েরা বেশ মজা করত। কৃষকের গোয়াল ঘরে, বাঁশ-ঝাড়ে এই হুতুম পেঁচার বিচরণ করত।

হুতুম পেঁচাকে কেউ পেঁচা, কেউ ধুধু, আবার কেউ লক্ষ্মী পেঁচা বলে থাকে। বর্তমান সময়ের ছোট ছেলেমেয়েরা এই হুতুম পেঁচাকে চিনে না বললেই চলে।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় নির্বিচারে প্রাকৃতিক বৃক্ষ নিধন আর ফসল আবাদ করতে জমিতে বিভিন্ন প্রকার কীটনাশক ব্যবহার এবং অবাধ শৌখিনতার বসে শিকারের কারণে হুতুম পেঁচা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।

বিজ্ঞজনদের মতে,পরিবেশ বান্ধব পেঁচা অকল্যাণ নয় মানব কল্যাণে সাদিত হয়।        
লক্ষ্মী পেঁচা হয়ত একদিন চিরতরে বিলুপ্তি হয়ে যাবে। আমাদের দেশে কোন কিছু শেষ হলে তার কদর বেড়ে যায়।।তাইত রক্ষা করা খুবী প্রয়োজন।

লেখক :শিক্ষানুরাগী
ইমেইল : hazimohammadmohsin@gmail.com

Related Posts

সর্বশেষ ও আলোচিত

সোনারগাঁওয়ে আগুনে প্রেমিকের বসত ঘর পুড়ে ছাঁই, দগ্ধ ৩

সোনারগাঁওয়ে আগুনে প্রেমিকের বসত ঘর পুড়ে ছাঁই, দগ্ধ ৩

নিজস্ব প্রতিবেদক, সোনারগাঁও নিউজ  : প্রেমিকাকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অপরাধে প্রেমিকের...

সোনারগাঁওয়ে জিএসসি পরীক্ষার্থীসহ ৫ জনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম

সোনারগাঁওয়ে জিএসসি পরীক্ষার্থীসহ ৫ জনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম

নিজস্ব প্রতিবেদক, সোনারগাঁও নিউজ : নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে জমি নিয়ে বিরোধের জের...

সোনারগাঁওয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলে তৌহিদী জনতার ঢল

সোনারগাঁওয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলে তৌহিদী জনতার ঢল

নিজস্ব প্রতিবেদক, সোনারগাঁও নিউজ  : মিয়ানমারের রাখাইনে মুসলিম রোহিঙ্গাদের উপর সেনাবাহিনী...

মরহুম আবুল হাসেম স্মরণে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত

মরহুম আবুল হাসেম স্মরণে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত

নিজস্ব প্রতিবেদক,সোনারগাঁও নিউজ:   সোনারগাঁও জনপ্রতিনিধি ঐক্য ফোরাম এর উদ্যোগে বারদী...

সোনারগাঁও থেকে সাভারে বেড়াতে গিয়ে ৪ দিন ধরে স্কুল ছাত্র নিখোঁজ

সোনারগাঁও থেকে সাভারে বেড়াতে গিয়ে ৪ দিন ধরে স্কুল ছাত্র নিখোঁজ

নিজস্ব প্রতিবেদক,সোনারগাঁও নিউজ: সোনারগাঁও থেকে সাভারের আশুলিয়ায় ফুফুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে...

সোনারগাঁও থানার এসআই আজাদের সহযোগিতায় অনার্স পরীক্ষার্থী রিকশা চালক পিপুলের ভাগ্যের পরিবর্তন

সোনারগাঁও থানার এসআই আজাদের সহযোগিতায় অনার্স পরীক্ষার্থী রিকশা চালক পিপুলের ভাগ্যের পরিবর্তন

নিজস্ব প্রতিবেদক,সোনারগাঁও নিউজ: নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানার পদন্নোতি পাওয়া সেই এসআই আবুল...

সোনারগাঁওয়ে মায়ের কোলে চড়ে পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-৪.৪৫ পেলেন প্রতিবন্ধি রিনা

সোনারগাঁওয়ে মায়ের কোলে চড়ে পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-৪.৪৫ পেলেন প্রতিবন্ধি রিনা

শাহাদাত হোসেন রতন : নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে মায়ের কোলে চড়ে এসএসসি পরীক্ষা...

সোনারগাঁও আসনে নৌকার নতুন মুখ আনোয়ারুল কবির ভূইয়া

সোনারগাঁও আসনে নৌকার নতুন মুখ আনোয়ারুল কবির ভূইয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক, সোনারগাঁও নিউজ: নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁও) আসনে নৌকার নতুন  মুখ  আনোয়ারুল...

সোনারগাঁওয়ের অপরূপ নিদর্শণ সেই ঠাকুর বাড়িটি

সোনারগাঁওয়ের অপরূপ নিদর্শণ সেই ঠাকুর বাড়িটি

হাজী মোহাম্মদ মহসীন: রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ২৪ কিলোমিটারের পথ পাড়ি...

এডিশনাল এসপি আকতার হোসেনের পিতা হাজী মাঈনুদ্দীন বেপারীর ইন্তেকাল

এডিশনাল এসপি আকতার হোসেনের পিতা হাজী মাঈনুদ্দীন বেপারীর ইন্তেকাল

নিজস্ব প্রতিবেদক, সোনারগাঁও নিউজ : বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহিদুল...