হাসান মাহমুদ রিপন:
লাখো পুর্ণার্থীর অংশ গ্রহনে ও পথে পথে চরম ভোগান্তির মধ্য দিয়ে হিন্দু সনাতনীদের লাঙ্গলবন্দ অষ্টমী স্নান উৎসব উদযাপিত হয়েছে। গত শুক্রবার রাত থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দীর্ঘ যানজটের কবলে পড়েন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ ও বন্দর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদে তীর্থ লাঙ্গলবন্দ মহাষ্টমী স্নান উৎসবে আসা পুণ্যার্থীরা। পাপ মোচনে ব্রহ্মপুত্র নদে তীর্থ মহাষ্টমী স্নান উৎসবে মেতেছেন তারা। শুক্রবার দিবাগত রাত ২টা ১১ মিনিট শুরু হয়ে স্নান উৎসবের লগ্ন শেষ হয় শনিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে। স্নানের লগ্ন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎসবে মেতে উঠেছে দেশ-বিদেশ থেকে আসা পূণ্যার্থীরা। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল ও ভুটানসহ দেশ ও বিদেশ থেকে আসা পুণ্যার্থীরা এ স্নানোৎসবে অংশ নেন। এদিকে লাঙ্গলবন্দে স্নানোৎসব সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পাদন করতে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে জেলা পুলিশ।
অপরদিকে লাখো পুর্ণার্থীর পদচারণায় মহাসড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। গাড়ির চাপ বেশি থাকায় কয়েকটি পাকিং জোন পরিপূর্ণ হয়ে যাওয়ায় পূর্ণ্যার্থীদের গাড়ি মহাসড়কে রাখার কারণে এ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। যানজটে পূণ্যার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। লাঙ্গলবন্দের স্নানে পুণ্যার্থীদের আসার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর থেকে মেঘনা সেতুর টোল প্লাজা পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার রাস্তায় যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন কাজে যাওয়া ও ঢাকায় ফিরতি মানুষ। পুলিশ জানিয়েছেন, হিন্দুদের মহা অষ্টমীর স্নান উৎসব উপলক্ষে মহাসড়কে এ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশের ২০টি টিম যানজট নিরসনে কাজ করেন। হাইওয়ে পুলিশ জানান, লাঙ্গলবন্দে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের যাত্রাকে ঘিরে লাখ লাখ মানুষের আগমনের কারণে এ যানজট তৈরি হয়েছে।
হিন্দু শাস্ত্র মতে, হে মহাভাগ ব্রহ্মপুত্র, হে লৌহিত্য, আমার পাপ হরণ করো এ মন্ত্র পাঠ করে ফুল, বেলপাতা, ধান দুর্বা, হরিতকি, ডাব, আমপাতা পিতৃকুলের উদ্দেশ্যে অর্পণ করেন পুণ্যার্থীরা। লাঙ্গলবন্দের নলিত মোহন সাধু ঘাট থেকে শুরু হয়ে সাবদী লোকনাথ মন্দির পর্যন্ত ১৮টি ঘাটে স্নান করেছেন পুণ্যার্থীরা। এ স্নান উৎসব উপলক্ষে লাঙ্গলবন্দ তিন কিলোমিটার এলাকায় তিনদিন ব্যাপী লোকজ মেলা বসেছে। সেখানে হিন্দু ধার্মালম্বী ছাড়াও মুসলিম ধর্মের অনেক মানুষ কেনাকাটা করছেন।
এদিকে মহাষ্টমী স্নান উৎসবকে কেন্দ্র করে শুক্রবার রাত থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর মোড় থেকে সোনারগাঁওয়ের মেঘনা টোল প্লাজা পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। লাঙ্গলবন্দের ব্রহ্মপুত্র নদের তীর্থ যাত্রাকে কেন্দ্র করে কয়েক লাখ মানুষের আগমন ঘটার কারণে এ যানজটের সৃষ্টি হয়। যানজটের ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন তীর্থ যাত্রীসহ কর্মস্থলে যাওয়া যাত্রী ও সাধারণ মানুষ। মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে পূণ্যার্থীরা যানবাহন থেকে নেমে রাস্তা পারাপারের কারণে সিগন্যালে এ যানজট সৃষ্টি হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দড়িকান্দি, মদনপুর, জাঙ্গাল, লাঙ্গলবন্দসহ কয়েকটি পয়েন্টে পূণ্যার্থীরা যানবাহন থেকে নেমে রাস্তা পারাপারের কারণে এ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। পূণ্যার্থীদের আগমনের কারণে মহাসড়কে ভোর থেকেই যানবাহনের চাপ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে তীব্র যানজটের কারণে অধিকাংশ জায়গায় পূন্যার্থীসহ যাত্রীদের পায়ে হেঁটে অফিস ও কর্মস্থলে যেতে দেখা যায়। অনেকেই আবার যানজটের কারণে বাসায়ও ফিরে গিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন জরুরি কাজে বের হওয়া নারী ও বৃদ্ধরা। বিভিন্ন যানবাহনে বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
রিফাত হোসেন নামের এক চাকরিজীবী বলেন, মোগড়াপাড়া চৌরাস্তা যাওয়ার জন্য ৩০ মিনিট আগে কাঁচপুর মোড় থেকে নাফ বাসে উঠেছি। কিন্তু রাস্তায় এত যানজট যে, বাস এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন।
মনোয়ার নামের এক গার্মেন্টস শ্রমিক জানান, দীর্ঘক্ষণ বাসে বসে আছি। কতোক্ষণ রাস্তার এই অবস্থা থাকবে জানি না। তাই হেঁটেই কাজে যাবো।
নরসিংদী পাঁচদোনা থেকে আসার পূর্নার্থী লিটন দাস, মিতু রানী দাস দম্পতি বলেন, প্রতি বছর লাঙ্গলবন্দ স্নান করতে আসেন তারা। পাপ মোচন হবে এমন বিশ্বাসে তারা এখানে স্নান করতে আসেন। শনিবার ভোর ৫ টায় তারা নরসিংদী থেকে রওনা হয়ে দুপুর সাড়ে ১২ টার দিকে এখানে পৌছান। পথে পথে তারা ভোগান্তিতে পড়েছেন। যানজটের ভোগান্তির পাশাপাশি তাদের বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়েছে। তারপরও ব্রহ্মপুত্র নদে স্নান করতে পেরে তারা আনন্দিত।
বেসরকারী এনজিও প্রতিষ্ঠানের চাকুরীজীবী আলমগীর। তিনি জানান, ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশ্যে সোনারগাঁওয়ে টিপরদী থেকে শনিবার সকাল ৮ টার দিকে বের হয়ে দুপুর ১২ টায় তিনি মদনপুর বাসট্যান্ডে এসেছেন। দীর্ঘ সময় বাসে বসে পার করে তিনি বাড়ি ফিরে গেছেন।
অন্যদিকে মহা অষ্টমী স্নানোৎসবে অংশ নিতে লাঙ্গলবন্দের তিন কিলোমিটার এলাকায় ঘাটগুলোতে পুণ্যার্থীরা ভিড় করেন। নারী-পুরুষ পুণ্যার্থীরা সড়ক পথ ও নৌপথে স্নানে অংশ নিতে আসেন। পুণ্যার্থীরা ললিত সাধুর ঘাট, অন্নপূর্ণা মন্দিরঘাট, নাসিম ওসমান ঘাট, গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর মন্দির রাজঘাট, কালীগঞ্জ ঘাট, মাকরী সাধুর শান্তি আশ্রমঘাট, মহাত্মা গান্ধীর শশ্মানঘাট, ভদ্রেশ্বরী কালীমন্দির ঘাট, জয়কালী মন্দিরঘাট, রক্ষাকালী মন্দিরঘাট, পাষাণকালী মন্দিরঘাট, স্বামী দ্বিগিজয় ব্রহ্মচারীর আশ্রম, চর শ্রীরামপুর ব্রহ্মাঘাট, দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি ঘাট, মীরকুণ্ডি পরেশ সাধুঘাট, সাবদী রক্ষাকালী ঘাট, তাজপুর-জহরপুর মুনি ঋষিপাড়া ঘাট ও লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রমঘাটে স্নানে আসেন। ঘাটগুলোতে পুরোহিতের কাছে মন্ত্রপাঠ করে স্নানে নেমে পড়েন তাঁরা।
লাঙ্গলবন্দের মন্দিরগুলোতে চলছে পূজা-অর্চনা ও ভক্তিমূলক গান। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো থেকে পুণ্যার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে খিচুড়ি, দুধ, পানিসহ বিভিন্ন খাবার। অষ্টমীর স্নান উপলক্ষে সোনারগাঁয়ে দড়িকান্দি, কালীগঞ্জ, বন্দরের লাঙ্গলবন্দ এলাকাজুড়ে চলছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
কুমিল্লা থেকে এসেছেন অর্পিতা আচার্য্য। তিনি বলেন, ছেলে ও ছেলের বউকে নিয়ে স্নান করতে এসেছি। পাপমোচনে ও আমরা সবাই যাতে ভালো থাকতে পারি, ব্রহ্মার কাছে সেই প্রার্থনা করেছি।
কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ওসি কাজী ওয়াহিদ মুর্শেদ জানান, লাঙ্গলবন্দ স্নান উৎসবে পূণ্যার্থীদের আগমনকে ঘিরে যানবাহনের অতিরিক্ত চাপে এ দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। যানজট নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশের প্রায় ২০টি টিম মহাসড়কে কাজ করছেন। পুলিশের প্রচেষ্টায় বিকেলে যানজট কমেছে। শনিবার বিকেল ৫টার দিকে যানজট স্বাভাবিক হয়েছে। পূণ্যার্থীদের ঢল থাকায় যানজট তীব্র হয়েছে। লাঙ্গলবন্দের ছোট একটি সড়কে সড়কে দুই লাখ মানুষ একসাথে নেমে আসায় যানজট সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরো বলেন, সবচেয়ে বড় বিপত্তি ছিল লোকজন মোড়ে মোড়ে হাত তুলেই রাস্তা পারাপার হয়েছেন। এর মধ্যে গাড়ি চলমান থাকলে দুর্ঘটনার শঙ্কা থাকে। রাস্তা পারাপারের কারণেও যানজট হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, নিরাপত্তায় এবার আমাদের সঙ্গে সেনাবাহিনী রয়েছে। পুণ্যার্থীদের সুবিধার্থে ম্যাপ টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবার স্নানোৎসব আনন্দমুখর পরিবেশে উদযাপন হয়েছে।
আপনার মতামত দিন