রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ০২:১৭ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, সোনারগাঁও নিউজ :
আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি শেষ হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে মাসব্যাপী লোক কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসব। শেষ মুহুর্তে জমে উঠেছে এ মেলা। ছুটির দিনে দর্শনার্থীদের ঢল নামে মেলা চত্বর এলাকা।
শুক্রবার ছুটির দিনে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের বিশাল চত্বর জুড়ে জমে ওঠা মেলায় আগত দর্শনার্থীদের ভীড় ছিল। যেন উৎসবে মেতে উঠেছে মেলা চত্বর ও এর আশ পাশ এলাকা। গ্রামের প্রতি নাড়ির চিরন্তন টান আর ভালবাসার আকর্ষনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দলবদ্ধভাবে ভীড় করছে এ মেলায়।
জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি থেকে উৎসরিত লোক ও কারুশিল্পের ঐতিহ্যকে তুলে ধরার লক্ষ্যে এ বছর গত ১৮ জানুয়ারী থেকে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী এ মেলা। বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিবছরই এ মেলার আয়োজন করে। ৩৪ তম মেলার আসরে এবারে মেলাও ভিন্নতায় এনেছে মেলার আয়োজক প্রতিষ্টান এবারের মেলায় বিশেষ আকর্ষণ ‘তারুণ্যের উৎসব-২০২৫’ শীর্ষক ‘ ঐতিহ্যের আলিঙ্গণ’ শিরোনামে বিশেষ প্রদর্শনী ও অনুশীলন চত্বর স্থাপন।

শুক্রবার সকাল থেকেই মেলা চত্বরে দর্শনার্থীর ঢল। সোনারগাঁওয়ে ভ্রমণে বা পিকনিকে এসে অনেকে মেলাকে বাড়তি পাওনা হিসেবে কথা বলছেন অনেকেই।
ময়মনসিংহ শহর থেকে পিকনিকে আসা সাগর, মনির, লোকমান, আতিক, জোবেদা, সাথি, আশরাফসহ একদল যুবক জানান, এখানে পিকনিকে এসে সোনারগাঁওয়ের ইতিহাস ঐতিহ্যে দেখার পাশাপশি বাড়তি পাওয়া হিসেবে বাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য কারুশিল্প মেলাটি উপভোগ করলাম।
মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান থেকে মেলায় ঘুরতে আসেন সাইদুর রহমান আমান, রতন দেবনাথ, সাকিল আহমেদ। তারা বলেন, আমরা তিন বন্ধু আমাদের পরিবার নিয়ে মেলায় ঘুরতে এসেছি। বাংলার নানা ঐতিহ্যবাহী জিনিস দেখে খুব ভালো লাগছে। সব স্টল ঘুরে ঘুরে দেখেছি। ভাল লাগছে ‘তারুণ্যের উৎসব-২০২৫’ শীর্ষক ‘ ঐতিহ্যের আলিঙ্গণ’ শিরোনামে বিশেষ প্রদর্শনী চত্বর ঘুরে। এ প্রদর্শনীতে পুরো বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী হারিয়ে যাওয়া কারুপন্যে সম্ভার দেখে। অনেক কারুপন্যও কিনেছি।
মেলায় মনিপুরি বাহারি পণ্য দিয়ে স্টল সাজিয়েছেন রেহেনা পারভীন। তিনি বলেন, এ মেলা ইতিহাস ঐতিহ্যের মেলা। ছুটির দিন থাকায় লোক সমাগম ভালো হয়েছে। এবারের মেলা অন্যবারের চেয়ে বিক্রিও ভালো হয়েছে।

মেলার বিশেষ আকর্ষন হলো আয়োজক প্রতিষ্ঠানের বিশেষ প্রদর্শনী দেশের প্রথিতযশা কারুশিল্পীদের শিল্পকর্ম নিয়ে “কর্মময় কারুশিল্পী” প্রদর্শনী। এছাড়া এবারের মেলা আরো একটি বিশেষ আর্কষণ ‘তারুণ্যের উৎসব-২০২৫’ শীর্ষক ‘ ঐতিহ্যের আলিঙ্গণ’ শিরোনামে বিশেষ প্রদর্শনী । এটি মেলার মূল চত্বরের মাঠের মাঝে অবস্থান।
কর্মরত কারুময় কারুশিল্পী প্রদর্শনীতে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রথিতদশা ৬৪ জন কারুশিল্পী সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। সোনারগাঁওয়ের জামদানী, মৌলভীবাজার ও মুন্সিগঞ্জের শীতল পাটি, মাগুরা ও ঝিনাইদহের শোলাশিল্প, রাজশাহীর শখের হাঁড়ি ও মৃৎশিল্প, কক্সবাজারের শাঁখা ঝিনুক শিল্প, রংপুরের শতরঞ্জি, ঠাকুরগাঁয়ের বাঁশের কারুশিল্প, কাঠের চিত্রিত হাতি- ঘোড়া-পুতুল, কুমিল্লার খাদিশিল্প, তামা-কাঁসা-পিতলের কারুশিল্প, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলার ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠীর কারুশিল্প, কিশোরগঞ্জের টেরাকোটা পুতুল, বগুড়ার লোকজ খেলনা ও বাদ্রযন্ত্রসহ বিভিন্ন কারুশিল্পীরা তাদের স্বহস্তে তৈরি কারুপন্য প্রদর্শন ও বিক্রি করছেন। এখানে শিল্পীরা বসেই তাদের নিপুন হাতে নিজস্ব মেধা ও মননে তৈরি করছে বাহারী কারুপণ্য।

মেলায় আবহমান বাংলার গ্রাম্য শালিশ, দাদি নাতির গল্প বলা, ঢেঁকিতে ধানভানা, নকশী পিঠা তৈরি,পালকিতে বর কনে, কনে দেখা, বর যাত্রা, গায়ে হলুদ, পন্ডিত মশাইয়ের পাঠশালা, জামাইকে পিঠা খাওয়ানো ইত্যাদি জীবন্ত প্রদর্শনী কারুশিল্প মেলার একপাশে চলছে। সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা এতে অংশগ্রহন করছে। মেলা বরাবরেই নাগরদেলা, বায়োস্কোপ, বিমান চড়কি, পুতুল নাচ রয়েছেই।
মেলা দেখে আর কারুপণ্য কিনে ক্লান্ত শরীরে বিকেলে বসে শুনছেন ময়ূরাকৃতির সোনারতরী মঞ্চ থেকে ভেসে আসা বাউলগান, পালাগান, লোক সংগীত শিল্পীদের পল্লীগীতি, ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালী, জারিসারি, হাসনরাজা, লালন, শাহ আব্দুল করিম, রাধারমণের গান, ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গম্ভীরা, আলকাপ, পুথিপাঠ, উকিলমুন্সী, লোকজ নৃত্যনাট্য, চর্যাগান, লোকগল্পবলা ও মাইজভান্ডারীসহ বিভিন্ন ধারার লোকগীতি।

ফাউন্ডেশনের পরিচালক কাজী মাহবুবুল আলম জানান, কারুশিল্পের প্রসারের জন্য প্রতি বছরের মত আকর্ষণীয় বিভিন্ন খেলা, গান, প্রদর্শনী অনুষ্ঠান ছাড়াও এবারের উৎসবে গ্রাম বাংলার আর্থসামাজিক জীবনের প্রতিচ্ছবি উপস্থাপন করা হয়েছে বৈচিত্রময় ভাবে। ছুটির দিনগুলোতে বহু দর্শনার্থীর সমাগম হয়। এবারের মেলায় মোট স্টল রয়েছে ১০০টি।
ছবি : মো. শফিকুর রহমান
আপনার মতামত দিন