শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ১০:৫৯ পূর্বাহ্ন
হাসান মাহমুদ রিপন,:
লালনের একতারার সুরের মূচ্ছুনায় ও ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে শুরু হয়েছে ৩৩ তম মাসব্যাপী কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসব। মঙ্গলবার বিকেলে সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের ময়ূর পঙ্খী লোকজ মঞ্চে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্ধোধন করা হয়। নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল কায়সার প্রধান অতিথি হিসেবে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
বাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য বাংলাদেশ লোক ও কারু শিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিবছরই মাসব্যাপী লোক কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসব আয়োজন করে থাকে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব খলিল আহমেদের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. ইমরুল চৌধুরী, সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সামসুল ইসলাম ভূঁইয়া, সিনিয়র সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমান মাসুম, নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নুরুন নবী, নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (খ-অঞ্চল) শেখ বিল্লাল হোসেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইব্রাহিম, মুক্তিযোদ্ধা ওসমান গণি, সোনারগাঁ পৌরসভা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তৈয়বুর রহমান, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক গাজী আমজাদ হোসেন। এসময় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব ও বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) কাজী নুরুল ইসলাম স্বাগত বক্তব্য রাখেন। মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে অতিথিরা মেলা চত্বর ঘুরে দেখেন। পরে সন্ধ্যায় এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।

লোক ও কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসবের প্রধান অতিথি নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল কায়সার বলেন, সোনারগাঁ ইতিহাস ঐতিহ্যের স্থান। সোনারগাঁওয়েই ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে লালন করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন গড়ে তুলেছেন। পর্যটন নগরী হিসেবে বিশ্বের দরবারে সোনারগাঁওকে কিভাবে পরিচিত করা যায় সেভাবেই বর্তমান সরকার কাজ করে যাবে।
তিনি আরো বলেন, দেশী ও বিদেশী অনেক পর্যটক এখানে আসবেন। তাদের সার্বিক নিরাপত্তা দিতে পর্যটন পুলিশের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সর্বদা তৎপর থাকবে।
মুন্সিগঞ্জের মীরকাদিম থেকে লোকজ মেলায় ঘুরতে আসা আবু তাহের ও আলমগীর দম্পত্তি বলেন, প্রতি বছর মেলার প্রথম দিনে আমাদের দুই ছেলেকে নিয়ে ঘুরতে আসা হয়। এখানে আসলে হারিয়ে যাওয়া তৈজসপত্রসহ অনেক কিছু এ প্রজন্মের আমার দুই সন্তানকে পরিচয় করে দিতে পারি। তাদের পুরানো অনেক কিছুর সঙ্গে পরিচয় ছিল না। কয়েক বছর ধরে এখানে এনে তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে পেরেছি।
দাউদকান্দি থেকে ঘুরতে আসা কলেজ শিক্ষার্থী সাইফুর রহমান বিপ্লব বলেন, এক সময়ে গ্রাম অঞ্চলে মেলা হতো। এখন আর সেই মেলা দেখা যায় না। মেলার প্রতি ভালোবাসার টানে জাদুঘরে মেলা দেখতে আসা হয়। এ মেলায় ভিন্ন রকম এক অনুভূতি পাওয়া যায়।
দেশীয় সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনে আয়োজিত মাসব্যাপী এ লোক কারুশিল্প মেলায় কর্মরত কারুশিল্পী প্রদর্শনী, লোকজীবন প্রদর্শন, পুতুল নাচ, বায়োস্কোপ, নাগরদোলা, গ্রামীণ খেলাসহ বাহারী পণ্য সামগ্রীর প্রদর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিদিন লোকজ মঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্কুলের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় বিলুপ্ত প্রায় গ্রামীণ খেলা, কর্মরত কারুশিল্পীর কারু পন্যের প্রদর্শনীসহ নানা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। মেলা চলাকালীন সময়ে ওই এলাকার যানজট, আইনশৃঙ্খলা ও খাদ্যের মূল্য তালিকা নিয়ে মতবিনিময় সভায় আলোচনা করা হয়। গতকাল মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া মেলা ১৪ ফেব্রæয়ারী পর্যন্ত মাসব্যাপী চলবে।
ফাউন্ডেশন সূত্র জানান, এবারের মেলায় কর্মরত কারুশিল্পী প্রদর্শনীর ৩২টি স্টলসহ ১০০টি স্টাল বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে। গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রথিতদশা ৬৪ জন কারুশিল্পী সক্রিয়ভাবে মেলায় অংশ নেবেন।
এ বছর মৌলভীবাজার ও ঝালকাঠীর শীতল পাটি, মাগুরার শোলাশিল্প, রাজশাহীর শখের হাঁড়ি ও মাটির পুতুল, রংপুরের শতরঞ্জি, সোনারগাঁ, টাঙ্গাইল ও ঠাকুরগাঁয়ের বাঁশ বেতের কারুশিল্প, ঐতিহ্যবাহী জামদানি, কাঠের চিত্রিত হাতি- ঘোড়া পুতুল, বন্দরের রিকশা পেইটিং, কুমিল্লার তামা-কাঁসা-পিতলের কারুশিল্প, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠীর কারুশিল্প, কিশোরগঞ্জের টেরাকোটা পুতুল, বগুড়ার লোকজ খেলনা ও কুমিল্লার লোকজ বাদ্যযন্ত্রের শিল্পীসহ ১৭ জেলার কারুশিল্পীগণ মেলায় অংশ নিবেন। এবারও মেলায় বিশেষ কর্মসূচি হিসেবে কারুশিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য ১৫টি স্টল প্রদান করা হয়েছে। মাসব্যাপী লোকজ উৎসব প্রতিদিনের সান্ধ্যকালীন অনুষ্ঠান লোকজ মঞ্চে বাউলগান, পালাগান, ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালীগান, জারি-সারিগান, হাছন রাজারগান, শাহ আব্দুল করিমের গান, লালন সঙ্গীত, ক্ষুদ্র- নৃ গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লোকজ নৃত্যনাট্য, গ্রামীণ খেলা, লাঠিখেলা, মুড়ি ওড়ানো, চর্যাগান, লোকগল্প বলা ইত্যাদি অনুষ্ঠান পরিবেশিত হবে।
আপনার মতামত দিন